Top News

কবি মাধুরী ব্যানার্জীর প্রবন্ধ : *মন বাউলের একতারা* -মাধুরী ব্যানার্জী

শান্তিনিকেতনের মেলা মাঠে সন্ধ্যার আলো নেমেছে। তাল-শাল গাছের ফাঁক দিয়ে লাল সূর্য ডুবে যাচ্ছে ধীরে। সেই ভিড়ের মাঝখানে বসে আছে এক তরুণ বাউল—নাম তার নীল। কাঁধে ঝোলানো একতারা, চোখে দূরের স্বপ্ন। নীল ছোটবেলা থেকেই গান ভালোবাসত। তার বাবা ছিলেন গ্রাম্য গায়েন, কিন্তু সংসারের টানে গান ছেড়ে দিতে হয়েছিল। নীল ঠিক করেছিল—সে মনকে বেঁধে রাখবে না। সে হবে বাউল, মনকে মুক্ত করে গাইবে। একদিন সে শুনেছিল লালন ফকির–এর গান। “মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি”—এই লাইন যেন তার বুকের ভেতর আগুন জ্বেলে দিয়েছিল। সে বুঝেছিল, বাউল হওয়া মানে শুধু গান গাওয়া নয়, মানুষের ভেতরের মানুষকে খুঁজে পাওয়া। নীলের একতারা ছিল খুব সাধারণ। কাঠের দণ্ডে একটু ফাটল, তারটাও পুরনো। তবু যখন সে টুং করে ছুঁয়ে দিত, সুর যেন আকাশ ছুঁয়ে যেত। গ্রামবাসীরা বলত, “ওর একতারায় জাদু আছে।” কিন্তু নীল জানত—জাদু একতারায় নয়, জাদু তার মনে। একদিন মেলায় এক ধনী ব্যবসায়ী এসে বলল, —“তোমার গান ভালো। শহরে চলো, বড় মঞ্চে গাইবে। টাকা, নাম—সব পাবে।” নীল একটু চুপ করে রইল। চোখ তুলে দেখল মেলার মাটির ধুলো, গ্রামের মানুষের হাসি, শিশুদের হাততালি। সে মৃদু হেসে বলল, —“আমার মঞ্চ এই মাটি, আমার শ্রোতা এই মানুষ। আমি মন বাউল, আমার একতারা মনেই বাঁধা।” সেই রাতেই নীল গাইল— মন রে, তুই কারে খুঁজিস দূর আকাশে? তোরই ভিতর বসে আছে সে ভালোবাসে। সুর ভেসে গেল শালবনের ওপরে, নক্ষত্রের কাছে। কেউ দেখল না, কিন্তু সেই রাতে অনেক মানুষের মন হালকা হয়ে গেল। নীলের একতারা তখনও বাজছে— কারণ মন যখন বাউল হয়, একতারার সুর কখনও থামে না।

Post a Comment

Previous Post Next Post