কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি:
আওয়ামীলীগ সরকারের আমলে কিশোরগঞ্জের সর্ববৃহৎ 'আঠারবাড়ীয়া গোপী রায়ের বাজার' যা সাজনপুর গরুর হাট নামে পরিচিত তা সর্বশেষ ইজারা মূল্য পায় প্রায় ৩০ লাখ টাকার মতো। কিন্তু সরকার পরিবর্তনের পর চলতি মৌসুমে বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়ে ইজারা হয় তিন কোটি ৯৩ লাখ ৫০ হাজার ৮শ’ টাকা মূল্যে।
অভিযোগ রয়েছে, বিগত সময়ে স্থানীয় একটি সিন্ডিকেটের কব্জায় ছিল হাটটি। সরকার উচ্চ মূল্যের ইজারা থেকে বঞ্চিত হয়ে নামে মাত্র ইজারা মূল্য পেতো। কিন্তু হাট থেকে উপার্জিত বড় অঙ্কের মধ্যে একটি অংশ তৎকালীন প্রশাসন থেকে শুরু করে এক শ্রেণির রাজনৈতিক রাঘব বোয়ালদের পেটে হজম হতো।
বর্তমানে ইজারা মূল্য বাড়লেও বাড়েনি জায়গার পরিমাণ। ৩৬ শতাংশ জমি ৩৬ ই রয়ে গেছে। সম্প্রসারণের দৃশ্যমান কোনো দৃশ্য চোখে পড়েনি।
ইজারাদার সূত্রে জানা যায়, ৩৬ শতাংশ জমি দখলে এক শ্রেণির দোকানীদের। সরকার নির্ধারিত জায়গায় বসানো যাচ্ছে না হাট।
স্থানীয়দের দাবি, ২০০৯ সালে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের নির্দেশক্রমেই এটি গরুর হাটে রূপান্তরিত হয়। পুরো জেলা জুড়ে সুনাম থাকায় এ হাটে প্রচুর পরিমাণ ক্রেতা বিক্রেতাদের পদচারণা হয়।
জানা যায়, প্রচুর গরু আসায় আশপাশের ব্যক্তিগত জমি ভাড়া নিয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করতে বাধ্য হন সংশ্লিষ্টরা। ইজারাকৃত মূল বাজারটিকে পেরিফেরির আওতায় পাঠানো হয়েছে বলেও একটি সূত্র নিশ্চিত করে।
আঠারবাড়ীয়া মৌজার আরএস ৭৩৭ দাগের ৩৬ শতক জমি “আঠারবাড়ীয়া গোপী রায়ের বাজার" হিসেবে বাংলা ১৪৩২ সনের জন্য ইজারা পায় জমশেদ আলী নামে স্থানীয় এক ব্যক্তি।
গত ২১ জানুয়ারি নিকলী উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট প্রতীক দত্ত স্কুল মাঠে গরুর হাট বসানোর দায়ে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করেন। এতে ৫ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়।
তবে ইজারাদারের দাবি তিনি স্কুল মাঠে গরুর হাট বসান না। যে জায়গাটিকে স্কুলের মাঠ মনে করা হয় আসলে তা স্কুলের না। কাগজপত্র ঘেটে দেখারও অনুরোধ করেন তিনি। ভৌগোলিক বিবেচনায় স্কুল সংলগ্ন রাস্তাটিই এ এলাকার চলাচলের প্রধান রাস্তা।
বরংচ বিগত সময়ে স্কুল মাঠে হাট বসানো হতো তার জন্য তিনি প্রতিবাদ করতেন। এরপর থেকে যে জায়গায় হাট বসছে এটি স্কুলের জায়গা না। নির্ধারিত জায়গায় অন্যদের দোকানপাট থাকায় স্থানীয় মানুষের জায়গা ভাড়া নিয়ে বিগত ১৭ বছরের মতোই তিনি হাটটি পরিচালনা করছেন বলেও দাবি তার।
উপজেলা নির্বাহী অফিসার রেহানা মজুমদার মুক্তি স্বাক্ষরিত একটি নোটিশে দেখা যায়, আঠারবাড়ীয়া গোপী রায়ের বাজারের নির্ধারিত জায়গার বাইরে হাট/বাজার না বসানোর জন্য চূড়ান্তভাবে সতর্ক করা হচ্ছে। অন্যথায় বিধি মোতাবেক ইজারা বাতিল করার কথা বলেন তিনি।
এ বিষয়ে ইজারাদার জমশেদ আলী বলেন, দীর্ঘদিন ধরে নির্ধারিত জায়গায় ব্যক্তি মালিকানাধীন দোকানপাট থাকায় বিক্ষিপ্তভাবে বসাতে হচ্ছে গরুর হাটটি। প্রশাসনের উচিত নির্ধারিত জায়গাটি অবমুক্ত করনের অভিযান চালানো। নির্ধারিত জায়গা উদ্ধার করে না দিয়ে এতো টাকার বাজারে অভিযান চালানো উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। বিশাল অঙ্কের ক্ষতি ও চালান না তুলতে পারার আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।
তিনি আরো বলেন, সরকার যেখানে প্রায় চারকোটি টাকা ইজারা পাচ্ছে বিগত সময়ের ত্রিশ লাখের পরিবর্তে, সেখানে সুষ্ঠুভাবে হাট পরিচালনা করতে ও নির্ধারিত জায়গা দখলে স্থানীয় প্রশাসনের উচিত সহযোগিতা করা। তা না করে বিভিন্ন আইনে মোবাইল কোর্টের নামে হয়রানি করা আতঙ্কের বিষয়।
তিনি আরো দাবি করেন, ঐতিহ্যবাহী হাটটি ধ্বংসের জন্য একটি শ্রেণি উঠেপড়ে লেগেছে। মোটা অঙ্কের উৎকুচ না পেয়ে একটি শ্রেণি প্রশাসনকে ভুল তথ্য দিয়ে বিভিন্ন কৌশল করার চেষ্টা করছে।
২৮ জানুয়ারি বুধবার সরেমজনি গিয়ে দেখা যায়, স্কুল মাঠে নয়, রাস্তার দু'ধারে ও ভাড়াকৃত জায়গায় বসেছে গরুর হাট। গত হাটে অভিযান হওয়ায় ক্রেতা বিক্রেতাদের সংখ্যা অর্ধেকে নেমে আতঙ্ক বিরাজ করছে সবার মাঝে। গত হাটের তুলনায় ধ্বস নেমেছে বাজারে। স্থানীয় খেটে খাওয়া শ্রমিকরা আতঙ্কিত হয়ে আছে।
জানা যায়, বিগত ১৭ বছরে এভাবেই চলছিল হাট। তৎকালীন প্রশাসন কোনো অভিযান পরিচালনা করেনি। এমনকি চলতি ইজারাদারের ৯ মাস পেরিয়ে গেলেও নিরব সম্মতি ছিল সবার। হঠাৎ করে গত সপ্তাহে উপজেলা এসিল্যান্ড প্রতীক দত্ত পুলিশ ও সেনাবাহিনী নিয়ে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করেন। তিনিও এতোদিন ছিলেন নিরব।
জানা যায়, ইজারাদার জমশেদ আলী পেশায় একজন সংবাদকর্মী। গত ৬ জানুয়ারি 'সাবেক ছাত্রলীগ ক্যাডার নিকলীর এসিল্যান্ড প্রতীক দত্তের দাপট' শিরোনামে দৈনিক নয়া দিগন্ত পত্রিকায় জমশেদ আলী একটি রিপোর্ট প্রকাশ করে।
সংবাদ প্রকাশের জেরেই ইজারাদার কাম সাংবাদিক জমশেদ আলীর গরুর হাটে অভিযান চালান এসিল্যান্ড প্রতীক দত্ত এমনটিই দাবি ইজারাদারের।
স্থানীয়রা জানান, জারইতলার প্রচুর মানুষের সাপ্তাহিক রুটি রোজগারের জায়গা এ হাটটি। চা সিগারেটের দোকান, খাবারের দোকান, গাড়ি রাখার স্ট্যান্ড, গরু পরিবহণে সহযোগিতা, গরুর ব্যবসা ও হাটের শৃঙ্খলার দায়িত্বসহ ভ্রাম্যমান প্রচুর কর্মসংস্থানের মাধ্যম এ হাটটি। স্থানীয় মসজিদ মাদরাসা ও সামাজিক কার্যক্রমেও অর্থ ব্যয় করা হয় হাটের উপার্জিত অর্থ থেকে। ভ্রাম্যমান আদালত পরিচালনা করায় গরুর সংখ্যা কমে গিয়ে রীতিমতো ধ্বস নেমেছে হাটটিতে।
প্রশাসনিক নজরদারি, তদারকি, ও হাট পরিচালনার জায়গা বৃদ্ধি করে এলাকার উন্নয়নে সহযোগিতা বৃদ্ধি করার জন্য জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের কাছে অনুরোধ করেন হাটের ইজারাদার জমশেদ আলীসহ খেটে খাওয়া লোকজন।

Post a Comment