ভারত-বাংলাদেশের সুপরিচিত কবি, কণ্ঠশিল্পী ও বিশিষ্ট ছড়াকার মাধুরী ব্যানার্জীর অণুগল্প: বেঁচে থাকার প্রেসক্রিপশনDailyBogra

 


বেঁচে থাকার প্রেসক্রিপশন

                        -মাধুরী ব্যানার্জী 


গ্রামের শেষ প্রান্তে ছোট্ট একটি ওষুধের দোকান চালাতেন বৃদ্ধ চিকিৎসক অমরবাবু। তিনি ডাক্তার হলেও গ্রামের মানুষ তাঁকে শুধু চিকিৎসক নয়, একজন অভিভাবক হিসেবেই মানত।

একদিন সকালে তাঁর চেম্বারে এলেন নীরেন। বয়স চল্লিশের কাছাকাছি, কিন্তু মুখে ক্লান্তির ছাপ। তিনি বললেন,

— ডাক্তারবাবু, শরীরটা ভালো লাগে না। সব সময় মন খারাপ, কাজে উৎসাহ পাই না।

অমরবাবু কিছুক্ষণ চুপ করে তাঁর দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করলেন। কিন্তু বড় কোনো শারীরিক অসুখ ধরা পড়ল না।

নীরেন অবাক হয়ে বললেন,

— তাহলে আমার রোগটা কী?

অমরবাবু টেবিলের ড্রয়ার থেকে একটি প্রেসক্রিপশন বের করে লিখতে শুরু করলেন। নীরেন ভাবলেন, নিশ্চয়ই দামি কোনো ওষুধ লিখছেন।

কিন্তু কাগজে লেখা ছিল—

সকাল: সূর্যোদয় দেখবে।

দুপুর: অন্তত একজন মানুষের উপকার করবে।

বিকেল: আধঘণ্টা হাঁটবে।

রাত: তিনটি ভালো ঘটনার কথা মনে করে কৃতজ্ঞতা জানাবে।

নীরেন বিস্মিত হয়ে বললেন,

— এ আবার কেমন ওষুধ?

অমরবাবু মৃদু হেসে বললেন,

— শরীরের ওষুধ আমি অনেক দিয়েছি, কিন্তু তোমার দরকার মনের ওষুধ। এক মাস পরে এসো।

এক মাস পর নীরেন আবার এলেন। এবার তাঁর মুখে হাসি, চোখে উজ্জ্বলতা।

— ডাক্তারবাবু, আশ্চর্য! আমি অনেক ভালো আছি। কাজেও মন বসছে, জীবনটাও সুন্দর লাগছে।

অমরবাবু বললেন,

— দেখেছো? বেঁচে থাকার সবচেয়ে বড় প্রেসক্রিপশন কোনো ওষুধের বোতলে থাকে না। তা লুকিয়ে থাকে প্রকৃতির সৌন্দর্যে, মানুষের পাশে দাঁড়ানোর আনন্দে, আর নিজের জীবনের প্রতি কৃতজ্ঞতায়।

নীরেন সেদিন বুঝতে পেরেছিলেন— জীবন শুধু শ্বাস নেওয়ার নাম নয়; প্রতিটি দিনকে অনুভব করার নামই সত্যিকারের বেঁচে থাকা। সুখী ও অর্থপূর্ণ জীবনই মানুষের সবচেয়ে কার্যকর ওষুধ।

Post a Comment

0 Comments