নামহীন অনুভূতি,
মাধুরী ব্যানার্জীঃ
শরতের বিকেল। সোনালি রোদ এসে পড়েছে গ্রামের পুরোনো পাঠাগারের জানালায়। বইয়ের তাকের ধুলো ঝেড়ে সাজাচ্ছিল অপর্ণা। কলেজের পড়াশোনা শেষ করে সে কয়েকদিনের জন্য গ্রামে এসেছে।
এক কোণে রাখা একটি পুরোনো ডায়েরি তার চোখে পড়ল। ডায়েরির মলাটে কোনো নাম নেই। কৌতূহলবশত সে খুলে দেখল। পাতায় পাতায় লেখা কিছু ছোট ছোট কথা—
"তোমাকে কখনও বলিনি, তবু তুমি আমার প্রতিটি দিনের অংশ হয়ে আছো।"
"তোমার হাসি দেখলে মনে হয় পৃথিবীটা এখনও সুন্দর।"
"এই অনুভূতির কোনো নাম নেই।"
অপর্ণা অবাক হয়ে পড়তে লাগল। লেখাগুলো যেন খুব পরিচিত কারও মনের কথা। কিন্তু কার?
পরদিন সে পাঠাগারের বৃদ্ধ রক্ষক নিবারণ কাকুকে ডায়েরির কথা জিজ্ঞেস করল।
নিবারণ কাকু একটু হেসে বললেন, “ওটা মৃদুলের ডায়েরি। বহু বছর আগে এই গ্রামে থাকত। খুব ভালো লেখালেখি করত। তারপর একদিন শহরে চলে যায়। আর ফিরে আসেনি।”
“কার জন্য লিখেছিল?” অপর্ণার কৌতূহল বাড়ল।
বৃদ্ধ দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
“একজনের জন্য। কিন্তু কোনোদিন তাকে বলেনি।”
অপর্ণা আর কিছু জিজ্ঞেস করল না। তবে ডায়েরিটা তার মনে অদ্ভুত এক আলোড়ন তুলল।
শেষ পাতায় একটি মাত্র লাইন লেখা ছিল—
"সব অনুভূতির নাম হয় না। কিছু অনুভূতি শুধু হৃদয়ে বেঁচে থাকে।"
ডায়েরি বন্ধ করে অপর্ণা জানালার বাইরে তাকাল। দূরে কাশফুল দুলছে বাতাসে।
হঠাৎ তার মনে হলো, জীবনে এমন অনেক মানুষ আসে, যাদের জন্য মনে এক অদ্ভুত টান জন্মায়। তাকে প্রেম বলা যায় না, বন্ধুত্বও নয়। তবু সেই অনুভূতি গভীর, নির্মল, আর চিরস্থায়ী।
সেদিন সন্ধ্যায় ডায়েরিটি আবার আগের জায়গায় রেখে দিল অপর্ণা।
কারণ সে বুঝেছিল—সব গল্পের শেষ জানা জরুরি নয়। কিছু গল্পের মতোই কিছু অনুভূতিও নামহীন থাকাই ভালো।

0 Comments