শর্তবিহীন ভালোবাসাঃ
-মাধুরী ব্যানার্জী
গ্রামের এক কোণে ছোট্ট একটি কুঁড়েঘরে থাকত বৃদ্ধা সরলা দেবী। তাঁর একমাত্র ছেলে অরুণ শহরে চাকরি করত। বহু বছর আগে সংসারের অভাব ঘোচাতে শহরে গিয়েছিল সে। প্রথমদিকে নিয়মিত চিঠি আর টাকা পাঠালেও ধীরে ধীরে যোগাযোগ কমে আসে।
গ্রামের মানুষ প্রায়ই বলত, “অরুণ তো আর ফিরবে না। তোমার কথা ওর মনে নেই।”
সরলা দেবী শুধু হেসে বলতেন, “মা-ছেলের সম্পর্ক কি এত সহজে ভোলে? ও ব্যস্ত আছে, তাই আসতে পারে না।”
প্রতিদিন বিকেলে তিনি উঠোনে বসে গ্রামের রাস্তার দিকে তাকিয়ে থাকতেন। কেউ জিজ্ঞেস করলে বলতেন, “আজ হয়তো আমার অরুণ আসবে।”
এভাবেই কেটে গেল অনেক বছর।
এক বর্ষার সন্ধ্যায় প্রবল বৃষ্টির মধ্যে একটি গাড়ি এসে থামল তাঁর বাড়ির সামনে। গাড়ি থেকে নেমে এল মধ্যবয়স্ক এক মানুষ। ভেজা চোখে সে মায়ের সামনে এসে দাঁড়াল।
“মা, আমাকে চিনতে পারছ?”
সরলা দেবী কাঁপা হাতে ছেলের মুখ ছুঁয়ে বললেন, “অরুণ!”
ছেলেটি মায়ের পায়ে মাথা রেখে কান্নায় ভেঙে পড়ল।
“মা, আমি তোমাকে অনেক কষ্ট দিয়েছি। কাজ আর নিজের জীবন নিয়ে এত ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলাম যে তোমার খোঁজই নিতে পারিনি। তুমি কি আমাকে ক্ষমা করবে?”
সরলা দেবী ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন।
“ক্ষমা? মা কি কখনও সন্তানের ওপর রাগ ধরে রাখতে পারে? তুই ভালো থাকলেই তো আমি ভালো আছি।”
অরুণ অবাক হয়ে মায়ের দিকে তাকিয়ে রইল। এত অবহেলা, এত বছরের দূরত্ব—তবু মায়ের চোখে কোনো অভিযোগ নেই, শুধু অগাধ স্নেহ।
সেদিন অরুণ বুঝতে পারল, পৃথিবীর সব ভালোবাসার মধ্যে মায়ের ভালোবাসাই সবচেয়ে মহান। কারণ সে ভালোবাসা কোনো শর্ত, প্রত্যাশা বা প্রাপ্তির ওপর নির্ভর করে না। সে ভালোবাসা শুধু দিতে জানে, বিনিময়ে কিছু চায় না।
সত্যিকারের ভালোবাসা শর্তবিহীন হয়। যেখানে স্বার্থ নেই, অভিযোগ নেই, আছে শুধু মমতা ও ক্ষমার অসীম শক্তি।

0 Comments