ভারত-বাংলাদেশের সুপরিচিত সাহিত্য-সারথী, প্রাবন্ধিক,সম্পাদিকা, গল্পকার,কণ্ঠশিল্পী,নাট্যাভিনেত্রী,ছড়াকার ও বিশিষ্ট কবি মাধুরী ব্যানার্জীর অণুগল্প : " অচলায়তনের বাতায়ন"

 



অচলায়তনের বাতায়ন

                     -মাধুরী ব্যানার্জী 


অচলায়তন—নামেই যেন থমকে থাকা এক পৃথিবী।

গ্রামের এক প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা সেই পুরনো দালানটা যেন সময়ের কাছে হেরে গিয়ে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছে। কারো আসা-যাওয়া নেই, নেই কোনো হাসির শব্দ—শুধু ভাঙা দেওয়াল আর ধুলো জমা জানালাগুলো নীরবে ইতিহাস বলে যায়।

সেই অচলায়তনের একমাত্র বাতায়নটা (জানালা) ছিল একটু আলাদা।

বাকি সব জানালা বন্ধ, কিন্তু এই একটাতে যেন এখনও জীবনের একটু স্পন্দন লেগে আছে। হালকা বাতাস এলেই সেটার পাল্লা কেঁপে ওঠে—মনে হয় যেন কেউ ভিতর থেকে ডেকে উঠছে।

টিনা ছোটবেলা থেকেই ওই দালানটার প্রতি অদ্ভুত টান অনুভব করত।

গ্রামের সবাই বলত, “ওটা অভিশপ্ত জায়গা, ওদিকে যাস না।”

কিন্তু নিষেধ যত বাড়ত, টিনার কৌতূহলও তত গভীর হত।

একদিন বিকেলে, আকাশে কালো মেঘ জমেছে, ঝিরঝিরে হাওয়া বইছে—টিনা চুপিচুপি এগিয়ে গেল অচলায়তনের দিকে।

দালানটার সামনে দাঁড়াতেই তার বুকের ভিতরটা ধকধক করে উঠল। কিন্তু সে থামল না।

ভাঙা দরজাটা ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই চারদিকের নীরবতা যেন তাকে গ্রাস করল।

ধুলো জমা মেঝে, মাকড়সার জাল, আর এক অদ্ভুত ঠাণ্ডা অনুভূতি।

হঠাৎ—

খচখচ শব্দ।

টিনা তাকাল।

সেই বাতায়নটা… নিজে থেকেই কেঁপে উঠছে।

সে ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল।

জানালার কাছে পৌঁছাতেই হঠাৎ বাইরে ঝড় শুরু হলো। বাতাসের ঝাপটায় জানালাটা পুরো খুলে গেল।

আর তখনই—

টিনা দেখল এক অদ্ভুত দৃশ্য।

জানালার ওপাশে সেই একই গ্রাম, কিন্তু সবকিছু যেন অন্যরকম—

লোকজন চলাফেরা করছে, শিশুরা খেলছে, কোথাও কেউ গান গাইছে।

এ যেন বহু বছর আগের এক জীবন্ত পৃথিবী!

টিনা অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকল।

হঠাৎ এক মেয়ের চোখে চোখ পড়ল তার। মেয়েটা ঠিক তার মতোই দেখতে!

মেয়েটা মৃদু হেসে হাত বাড়িয়ে দিল, যেন বলছে—

“এসো, এখানে জীবন থেমে নেই।”

টিনার মনে হলো, সে যদি একবার হাতটা ছুঁয়ে দেয়, তাহলে হয়তো এই নিঃসঙ্গতা থেকে মুক্তি পাবে।

কিন্তু ঠিক তখনই তার মায়ের কথা মনে পড়ল—

“সব চকচকে জিনিস সত্যি নয়।”

সে এক পা পিছিয়ে এল।

হঠাৎই ঝড় থেমে গেল।

জানালাটা ধীরে ধীরে আবার বন্ধ হয়ে গেল।

সবকিছু আবার আগের মতো নিস্তব্ধ।

টিনা বাইরে বেরিয়ে এল, বুক ধড়ফড় করছে।

সে বুঝল—অচলায়তন শুধু একটা পুরনো দালান নয়, এটা এক হারিয়ে যাওয়া সময়ের দরজা।

আর সেই বাতায়ন?

সেটা এমন এক আহ্বান, যা সবসময় টানে—

কিন্তু যার ভিতরে ঢুকলে হয়তো আর ফেরা যায় না।

সেদিনের পর থেকে টিনা আর কখনো অচলায়তনের দিকে যায়নি।

তবে মাঝে মাঝে রাতে, দূর থেকে সে শুনতে পায়—

সেই বাতায়নের পাল্লা কেঁপে উঠছে…

যেন কেউ এখনও অপেক্ষা করছে।

Post a Comment

0 Comments