ব্যক্তিত্ব
-মাধুরী ব্যানার্জী
রুদ্রর সবকিছুই যেন ঠিকঠাক—ভালো চাকরি, শহরের নামী ফ্ল্যাট, পরিচিত মহলে সম্মান। কিন্তু তবুও কোথাও একটা শূন্যতা তাকে প্রতিদিন গ্রাস করত। আয়নার সামনে দাঁড়ালে সে নিজেকেই চিনতে পারত না—মুখটা তার, কিন্তু মানুষটা যেন অন্য কেউ।
ছোটবেলায় রুদ্র ছিল খুব প্রাণবন্ত। আঁকতে ভালোবাসত, গান গাইত, গল্প লিখত। কিন্তু বড় হতে হতে, সমাজের নিয়ম আর প্রত্যাশার চাপে সে নিজের সেই রঙিন সত্তাকে ধীরে ধীরে ঢেকে ফেলেছিল। “স্থির হও, বাস্তববাদী হও”—এই কথাগুলোই তার চারপাশে বারবার প্রতিধ্বনিত হয়েছে।
একদিন অফিস থেকে ফেরার পথে সে দেখল রাস্তার ধারে এক ছোট ছেলে চক দিয়ে ফুটপাথে ছবি আঁকছে। ছবিটা ছিল খুব সাধারণ—একটা সূর্য, কিছু পাখি, আর একটা ছোট্ট ঘর। তবুও ছেলেটার চোখে ছিল এক অদ্ভুত আনন্দ।
রুদ্র দাঁড়িয়ে পড়ল।
—“তুমি এটা আঁকছো কেন?” সে জিজ্ঞেস করল।
ছেলেটা হেসে বলল,
—“কারণ আমার ভালো লাগে।”
এই সহজ উত্তরটা রুদ্রকে যেন ভেতর থেকে নাড়িয়ে দিল। “ভালো লাগে”—এই কথাটা সে কতদিন ভুলে গেছে!
সেই রাতে বাড়ি ফিরে অনেকদিন পর সে একটা পুরোনো খাতা বের করল। কলম হাতে নিতেই তার আঙুল কাঁপছিল। কিন্তু একটু পরেই শব্দগুলো নিজে থেকেই কাগজে নেমে এল—একটা গল্প, তার নিজের গল্প।
ধীরে ধীরে রুদ্র বুঝতে পারল, ব্যক্তিত্ব মানে শুধু সমাজের চোখে গ্রহণযোগ্য হওয়া নয়। ব্যক্তিত্ব মানে নিজের ভেতরের সেই সত্যিকারের মানুষটাকে খুঁজে পাওয়া, যাকে আমরা অনেক সময় চাপা দিয়ে রাখি।
কয়েক মাস পর, রুদ্র আর আগের মতো ছিল না। সে এখনও চাকরি করে, দায়িত্ব পালন করে—কিন্তু তার সাথে সাথে সে আবার গান গায়, আঁকে, লেখে। তার মুখে এখন একটা শান্ত হাসি থাকে, যা আগে কখনও ছিল না।
একদিন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে সে দেখল—এবার সে নিজেকেই চিনতে পারছে।
কারণ এবার তার প্রতিচ্ছবিতে শুধু একটা মুখ নয়, একটা সম্পূর্ণ মানুষ ধরা পড়ছে—
তার নিজের ব্যক্তিত্ব।

0 Comments